![]() |
মঙ্গলবার বিষয়টি নিশ্চিত করেন সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী। তিনি জানান, বিচারপতি রেজাউল হাসান ব্যক্তিগত কারণ উল্লেখ করেই পদত্যাগ করেছেন এবং প্রচলিত বিধি অনুযায়ী প্রধান বিচারপতির মাধ্যমে তা রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বিচারপতি রেজাউল হাসানের বিরুদ্ধে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে একটি প্রক্রিয়া চলমান ছিল, যা বিষয়টিকে আরও আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে অযোগ্যতা, অসদাচরণ বা গুরুতর অভিযোগ উঠলে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে তদন্তের সুযোগ রয়েছে। এই কাউন্সিল গঠিত হয় প্রধান বিচারপতি এবং তার পরবর্তী জ্যেষ্ঠ দুই বিচারপতিকে নিয়ে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট বিচারকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বিচারপতি রেজাউল হাসানের বিরুদ্ধে ২০১০ ও ২০১১ সালের দুটি কোম্পানি মামলার কার্যধারায় পক্ষপাতমূলক আচরণ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে তদন্ত চেয়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে আবেদন করা হয়। গত বছরের ২৪ নভেম্বর শাহ গ্রুপের চেয়ারম্যান কে এম মজিবুল হক সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছে এই আবেদন জমা দেন।
অভিযোগ পাওয়ার পর বিচারপতি রেজাউল হাসান গত ১০ ডিসেম্বর সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে একটি লিখিত ব্যাখ্যা দাখিল করেন বলে জানা গেছে। সেখানে তিনি নিজের অবস্থান তুলে ধরেন এবং অভিযোগগুলোর বিষয়ে ব্যাখ্যা প্রদান করেন। পরে চলতি বছরের ২৯ মার্চ তিনি কাউন্সিলে আরও একটি বিস্তারিত লিখিত আবেদন জমা দেন।
সূত্র জানায়, সংশ্লিষ্ট দুটি মামলার মধ্যে একটি মামলায় আপিল বিভাগে আবেদন করা হয়েছিল, যেখানে ২০১৭ সালে আবেদনকারীর স্ত্রীর পক্ষে প্রতিকার মেলে। অন্য মামলাটিতে আপিল করা হয়নি, ফলে সেটি হাইকোর্টের পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকে।
সর্বশেষ ২৯ মার্চ দেওয়া আবেদনে বিচারপতি রেজাউল হাসান উল্লেখ করেন, তার বিরুদ্ধে যদি কোনো অভিযোগ থেকে থাকে, তবে তা ২০১৭ সালেই সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে উত্থাপন করা যেত। এত দীর্ঘ সময় পর অভিযোগ আনা যৌক্তিক নয় বলেও তিনি দাবি করেন। একই সঙ্গে তিনি নালিশটি আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয় বলেও মত দেন।
তবে বিচারপতি সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়নি। অর্থাৎ অভিযোগ থাকলেও তা প্রাথমিক পর্যায়েই ছিল এবং পূর্ণাঙ্গ শুনানি বা তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়নি।
এদিকে বিচারপতি রেজাউল হাসানের পদত্যাগকে ঘিরে আইনাঙ্গনে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, চলমান অভিযোগ ও প্রক্রিয়ার প্রেক্ষাপটেই তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি ব্যক্তিগত কারণের কথাই উল্লেখ করেছেন।
পেশাগত জীবনে বিচারপতি রেজাউল হাসানের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৮৫ সালে তিনি জেলা আদালতের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। পরে ১৯৮৯ সালে হাইকোর্ট বিভাগের আইনজীবী এবং ২০০৪ সালে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন।
তার আইনজীবী হিসেবে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার পর ২০০৯ সালের ৩০ জুন তাকে হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০১১ সালের ৬ জুন তিনি হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান এবং এরপর থেকে তিনি দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
সব মিলিয়ে, ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে দেওয়া এই পদত্যাগের পেছনে চলমান অভিযোগ ও প্রক্রিয়ার প্রভাব আছে কি না, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা থাকলেও আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

Post a Comment